যুক্তরাষ্ট্র ৭৫ শতাংশ ম্যাচের আয়োজক বলেই নয়, এই বিশ্বকাপের পদে পদেই ‘আমেরিকানীকরণ’ ঘটেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির লীলাভূমিতে টিকিটের দাম ছুঁয়েছে সর্বকালের রেকর্ড।
রেকর্ড তো বিশ্বকাপে অনেকই হবে। তবে একটা রেকর্ড বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যাচ্ছে। সেই রেকর্ডটা কে করবে, জানেন? কোনো খেলোয়াড় নয়, কোনো দল নয়। আজতেকা স্টেডিয়াম!
জানা না থাকলে আপনার উৎসুক মনকে জানাই, বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের আবাহন হতে যাচ্ছে কোনো স্টেডিয়ামে। তিনটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের এই রেকর্ড মেসি–রোনালদো–ওচোয়ার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
মেক্সিকো সিটির এই আজতেকায় ১৯৭০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে খেলেছে মেক্সিকো ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইতালি–বুলগেরিয়া। দুটি ম্যাচেরই কোনো মীমাংসা হয়নি। প্রথমটি গোলশূন্য ড্র, দ্বিতীয়টি ১–১।
আজ ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা যদি ড্র করে মাঠ ছাড়ে, তাহলে আজতেকার আরেকটি ‘হ্যাটট্রিক’ও হয়ে যায়! ১৬ বছর আগে আফ্রিকায় প্রথম বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সেটাই হয়েছিল।
আজতেকার মতো রেকর্ড তো মেক্সিকোরও হচ্ছে। বিশ্বকাপে কোনো দিন কোয়ার্টার ফাইনালের বেশি যাওয়া হয়নি, কিন্তু আয়োজনের রেকর্ডে মেক্সিকোর নাম লেখা হয়ে যাচ্ছে সবার ওপরে।
এই বিশ্বকাপ নিয়ে কথাবার্তায় যুক্তরাষ্ট্রই যে ঘুরেফিরে আসছে, এতে তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি সর্বার্থেই ‘আমেরিকান বিশ্বকাপ’।
মুক্তবাজার অর্থনীতির লীলাভূমিতে টিকিটের দাম সর্বকালের রেকর্ড ছুঁয়েছে। এতটাই যে খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও যা মনে হচ্ছে ‘সাধ্যের’ বাইরে! ফাইনালের একটি টিকিটের দাম ২৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ওঠার খবর পাওয়া গেছে।
শুধু কি আর টিকিট, হোটেলভাড়া, যাতায়াত খরচ—সবকিছুতেই চলছে পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। শুধু সাধারণ দর্শকই নন, অংশগ্রহণকারী দলগুলো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে খরচ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করেছে।
ইরান দলকে নিয়ে যা হচ্ছে, সেটিও কি তা–ই নয়! বিশ্বকাপ খেলতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রে যাবে কি যাবে না—এই দোলাচল চলেছে অনেক দিন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেজক্যাম্প মেক্সিকোতে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে বিশ্বকাপের রেফারিকে ভিসা থাকার পরও বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অভূতপূর্ব ঘটনারও সাক্ষী এই বিশ্বকাপ।
ভিসা নিয়ে এমন আরও অনেক কাণ্ডই হয়েছে। গত কয়েকটি বিশ্বকাপে ম্যাচের টিকিট থাকা মানেই ছিল স্বাগতিক দেশে ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা। এবার একদমই তা নয়।
এটা মূলত আমেরিকার বিশ্বকাপ বলেই মেক্সিকো সিটির আজতেকাকে উদ্বোধনী ম্যাচটা দিয়ে ফাইনালটা চলে গেছে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ২০১১ সাল পর্যন্ত নিউ মিডোল্যান্ডস নামে পরিচিত স্টেডিয়ামটি নিউ জার্সিতে।
১৮ জুলাই সেখানেই মঞ্চস্থ হবে বিশ্বকাপ ফুটবল নামের মহানাটকের চূড়ান্ত অঙ্ক। চার বছর আগে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ–দুঃখ ঘুচেছিল বলে ফুটবল ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে গেছে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম।
এই প্রশ্নের উত্তর পেতেই তো এত আয়োজন, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ১৩টি দেশ। এই সংখ্যা একেক বিশ্বকাপে একেক রূপ নেওয়ার পর একসময় ১৬–তে স্থির হয়েছিল।
সেখানে থেকে ২৪, তারপর ৩২। যেখানে এবারের বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮টি দেশ। এর আগে কখনো তিন দেশে বিশ্বকাপ হয়নি, এত দেশও কখনো খেলেনি বিশ্বকাপে। এমন ‘প্রথম’ আরও অনেক আছে এই বিশ্বকাপে।
মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত আগের দুটি বিশ্বকাপেও কেউ তাদের ফেবারিট বলেনি। ৩২ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত আগের বিশ্বকাপেও যেমন স্বাগতিকদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়নি কোনো। এবারও হচ্ছে না।
আরেক সহ–আয়োজক কানাডাকে নিয়ে তো প্রশ্নই ওঠে না। কানাডাকে নিয়ে কথা হতে পারে একটাই—আইস হকির দেশে বিশ্বকাপ ফুটবল আদৌ কি কোনো আলোড়ন তুলতে পারবে!
কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর আলোচনা–সমালোচনার যে ঝড় উঠেছিল, এবার তা একদমই ওঠেনি। আলোচনা যা হচ্ছে, তা এই বিশ্বকাপের ‘বড়লোকের বিশ্বকাপ’ হয়ে যাওয়া নিয়ে।
এর বাইরে চিরাচরিত সেই আলোচনা তো থাকবেই। প্রতি বিশ্বকাপের আগেই যা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের চায়ের কাপে ঝড়। যাতে শামিল হন সাবেক তারকারাও।
বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন নিয়ে যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন কয়েকজন। দু–একজনের ভবিষ্যদ্বাণীতে নিজের দেশের প্রতি পক্ষপাতও হয়তো খুঁজে পেতে পারেন।
কারও ভবিষ্যদ্বাণী মিলবে, কারও মিলবে না। তবে একটা ভবিষ্যদ্বাণী বোধ হয় শতভাগ গ্যারান্টি দিয়েই করে ফেলা যায়। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ বলে এবার বোধ হয় গ্রুপ পর্ব থেকেই ‘বড়’ কোনো দলের বিদায়ঘণ্টা বাজবে না; বরং অনেক দলের জন্যই গ্রুপের তিনটি ম্যাচ হবে আসল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ।






























