মিরপুর ১৪ নম্বরের ১৩ বছর বয়সী মুহাম্মদ আলম বর্জ্য ও ময়লা সংগ্রহের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিরপুর ১৪ নম্বরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বর্জ্য ও ময়লা সংগ্রহ করে মুহাম্মদ আলম। ‘মহাজনের’ কাছ থেকে মাসে পায় ৯ হাজার টাকা। সংগ্রহ করা ময়লা থেকে প্লাস্টিক আলাদা করে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে কিছুটা বাড়তি উপার্জনের জন্য।
মুহাম্মদ আলম বলে, ‘সারা দিন ময়লার মধ্যে থাকি, কষ্ট তো লাগেই। কাম করনের লাইগা স্কুলও ছাইড়া দেওন লাগছে। কিন্তু কাম না করলে তো আর ভাত জুটবো না।’
শিশুশ্রমের বর্তমান অবস্থা
আজ ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘শিশুশ্রমকে লাল কার্ড: শিশুদের জন্য ন্যায্যতা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ’। কিন্তু দেশে মুহাম্মদ আলম একা নয়, তার মতো লাখো শিশুকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সে খাটাতে হচ্ছে নানা শ্রমে। দেশে কয়েক বছরের ব্যবধানে নতুন করে প্রায় ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিতে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৮ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমের সঙ্গে যুক্ত, যা ২০১৯ সালে ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তার মানে, আরও প্রায় ১২ লাখ শিশু যুক্ত হয়েছে শিশুশ্রমের সঙ্গে।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে ব্যবস্থা
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নারী ও শিশুশ্রম এবং মজুরি বোর্ড অধিশাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘শ্রম আইন ২০০৬-এ শিশুশ্রমকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনের আওতায় যেসব ফর্মাল সেক্টর (আনুষ্ঠানিক খাত) আছে, সেগুলো আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি। কোথাও শিশুশ্রমের নজির পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
তৈরি পোশাক, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ট্যানারি, রপ্তানিমুখী চামড়াজাত দ্রব্য ও পাদুকা, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, সিল্ক, সিরামিক ও কাচ—এই ৮ শিল্প খাতকে শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। শিশুশ্রমের মূল কারণ দারিদ্র্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন অনেক অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম হয়ে থাকে, যা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নয়। শিশুশ্রম দূর করতে অভিভাবক, জনপ্রতিনিধিসহ সব স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে।
শিশুদের গল্প
রাজধানীর উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে মরিয়ম। সেখানে তাকে দুই বছর বয়সী একটি শিশুর দেখাশোনা করতে হয়। শিশুটির মা-বাবা অফিসে গেলে মরিয়মকে সারা দিন ওই শিশুর যত্ন নিতে হয়। এ ছাড়া বাসার বিভিন্ন কাজও করতে হয় তাকে। থাকা–খাওয়ার বাইরে মাসে তার মজুরি সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।
মরিয়মের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। যেখানে সে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আর পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। গত বছর থেকে ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছে সে।
রাজধানীর ভাষানটেক এলাকার ছোট একটি সাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ করে ১২ বছর বয়সী মুহাম্মদ সুমন। আট বছর বয়সে এই দোকানে কাজ শুরু করেছিল সে। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর অভাবের তাড়নায় আর স্কুলে যাওয়া হয়নি তার।






























