ইসলামের দৃষ্টিতে ধনসম্পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো প্রশংসনীয় জিনিস নয়, আবার তা সহজাতভাবে কোনো নিন্দনীয় বস্তুও নয়। সম্পদ মূলত একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম বা উসিলা। এর নিজস্ব কোনো নৈতিক বা চারিত্রিক গুণ নেই; বরং এর ভালো–মন্দ বা গুণ ও দোষ নির্ভর করে সম্পূর্ণভাবে এর ব্যবহারকারী ও ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর।
বিষয়টি একটি ধারালো তরবারির সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি তলোয়ার নিজের সত্তায় ভালোও নয়, আবার মন্দও নয়। এটিকে যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে বা আত্মরক্ষার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন তা প্রশংসনীয়। আবার এই একই তলোয়ার যখন কোনো নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম করার জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন তা চরম নিন্দনীয়।
সম্পদের এই নিরপেক্ষতা একটি হাদিসে চমৎকারভাবে এসেছে। আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, ‘নবীজি আমার কাছে একজন দূত পাঠালেন এবং নির্দেশ দিলেন যেন আমি আমার পোশাক ও অস্ত্র পরিধান করে তাঁর কাছে উপস্থিত হই। আমি নির্দেশ মোতাবেক তাঁর দরবারে গেলাম। তখন তিনি অজু করছিলেন। তিনি আমার দিকে দৃষ্টি তুললেন, তারপর মাথা নিচু করলেন এবং বললেন, “আমর, তোমাকে একটি যুদ্ধাভিযানে পাঠাতে চাই, যেখানে আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখবেন এবং প্রচুর গণিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দান করবেন। তোমার জন্য একটি উত্তম সম্পদের আশা করছি।”
আমি আরজ করলাম, আল্লাহর রাসুল, সম্পদের লোভে আমি ইসলাম গ্রহণ করিনি; বরং ইসলামের প্রতি অনুরাগী হয়ে এবং আপনার সাহচর্য লাভের আশায় মুসলিম হয়েছি। নবীজি বললেন, আমর, মানুষের জন্য সৎ সম্পদ কতই না চমৎকার!’ (আল–আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ২৯৯)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম তাহাবি (রহ.) লিখেছেন, সম্পদ শুধু তখনই ‘সৎ সম্পদ’ বা ‘কল্যাণময় সম্পদ’ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা দিয়ে সেসব কাজ করা হয়, যা করার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন। আর যে ব্যক্তি তার বৈধ মালিকানাধীন সম্পদকে এভাবে সঠিক খাতে ব্যবহার করে, সে মূলত একজন সৎ মানুষ বা সালেহ ব্যক্তি। (ইমাম তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার, ১৫/৩২৭, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত)
সম্পদকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতাকে ইসলাম এতটাই উঁচুতে স্থান দিয়েছে যে অপরের এই গুণ দেখে নিজের মনে তেমন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একমাত্র দুটি বিষয়েই হিংসা করা যায়। প্রথমত, সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ ধনসম্পদ দান করেছেন, তারপর তাকে সেই সম্পদ ন্যায়ের কাজে বিলিয়ে দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছেন...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৩)
এখান থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে সমাজে সৎ মানুষেরা দুই ধরনের হতে পারে। সেই বিত্তশালী ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর দেওয়া সম্পদকে দুই হাতে অকাতরে মানবকল্যাণে ব্যয় করেন। সেই সাধারণ বা দরিদ্র ব্যক্তি, যিনি পবিত্র অন্তরে কামনা করেন—যদি তারও এমন সম্পদ থাকত, তবে তিনিও সেই ধনীর মতো পুণ্য অর্জন করতেন। নিয়তের বিশুদ্ধতার কারণে ইসলামে উভয়কেই সৎকর্মশীলদের কাতারে শামিল করা হয়েছে।
আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের একটি বড় ভুল ধারণা হলো, শুধু বিপুল অর্থের জোরেই একটি উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু ইসলামের দর্শন বলে, অর্থ নিজে কখনো সভ্যতা নির্মাণ করতে পারে না, যতক্ষণ না সেই অর্থের পেছনে একজন সৎ, দূরদর্শী ও আদর্শ মানুষ থাকে।
সম্পদের নিজস্ব কোনো কার্যকারিতা নেই। এর কার্যকারিতা আসে তার মালিকের সদিচ্ছার মাধ্যমে। হাজারো কোটিপতি আছেন, যাঁদের বিপুল ঐশ্বর্য উম্মাহর কোনো উপকারে আসে না, কোনো দরিদ্রের মুখের অন্ধকার দূর করে না, জ্ঞান–বিজ্ঞানের প্রসারে অবদান রাখে না। বরং শুধু বিলাসবহুল উৎসব–মহোৎসবের পেছনেই অপচয় হচ্ছে। ফলে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা সামাজিক উন্নয়নে স্থবির হয়ে আছে।
ইসলাম মানুষের সম্পদ নিয়ে তৈরি হওয়া একটি বড় ভুল বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। অনেকে মনে করেন, আল্লাহ যাঁকে প্রচুর ধনসম্পদ দিয়েছেন, তিনি আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি, আর যিনি দরিদ্র তিনি আল্লাহর দরবারে লাঞ্ছিত। এ ধারণা নাকচ করে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘মানুষের অবস্থা তো এই যে তার প্রতিপালক যখন তাকে পরীক্ষা করেন, তাকে সম্মান দান করেন ও অনুগ্রহ করেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করেছেন। আবার যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন, তার জীবিকা সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে হেয় করেছেন। কখনোই নয়...।’ (সুরা ফজর, আয়াত: ১৫–১৭)
অর্থাৎ, প্রাচুর্য ও অভাব, উভয় অবস্থাই আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য একেকটি পরীক্ষা। ইবনে আশুর (রহ.) লিখেছেন, ‘আল্লাহর দেওয়া সম্পদ বা সম্মান যেমন মানুষের জন্য পরীক্ষা, তেমনি রিজিকের সংকীর্ণতাও পরীক্ষা। জাগতিক অবস্থা দিয়ে কখনোই আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা পরিমাপ করা যায় না।’
কোরআনে ব্যবহৃত ‘কাল্লা’ (কখনোই নয়) শব্দটি দিয়ে মানুষের সেই ভুল ধারণাকে তীব্রভাবে ধমক দেওয়া হয়েছে, যা বাহ্যিক সুখ বা দুঃখকে আল্লাহর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির মাপকাঠি মনে করে। ( আত–তাহরির ওয়াত–তানভির, ৩০/৩২৯–৩৩১, দারুত তিউনিসিয়াহ, তিউনিস)
ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে মানুষের আর্থিক অবস্থা তার পরকালীন মুক্তি বা সফলতার মানদণ্ড নয়। সম্পদ যেমন অহংকারের বস্তু নয়, ঠিক তেমনি দারিদ্র্যও কোনো অপমানের বিষয় নয়। মানুষের প্রকৃত মূল্য তার সম্পত্তির পরিমাণে নয়; বরং ভেতরের তাকওয়া, সততা ও তার অর্জিত সম্পদ সে সমাজের কতটুকু কল্যাণে ব্যয় করল, তার ওপর নির্ধারিত হয়।
সম্পদকে আখেরাতের পাথেয় বানানোর নিয়ত থাকলে তা প্রশংসনীয়, অন্যথা তা শুধুই এক মরীচিকা। একজন মুমিনের উচিত নিজের আত্মিক ও সামাজিক মূল্যকে সম্পদের অঙ্কে না মেপে, তার ত্যাগ, উদারতা ও মানবসেবার দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা।




















