চট্টগ্রামের নালাপাড়ার দুর্গাপূজায় ধর্মের পরিচয় ছাপিয়ে বন্ধুত্ব ও আনন্দই মুখ্য। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সাল থেকে কোর্ট বিল্ডিংয়ের কর্মকর্তা সতীশবাবুর উদ্যোগে প্রথম পূজা শুরু হয় এই পাড়ায়। পরে পূজাটা বারোয়ারি হয়ে ওঠে। সত্তর-আশির দশক থেকেই নালাপাড়ার পূজা চট্টগ্রাম শহরের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
মহালয়ার দিন থেকেই বাজত মাইক। শুরু হতো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের মহিষাসুরমর্দিনী দিয়ে। মণ্ডপের মাইক থেকে ভেসে আসা সুরের সঙ্গে আমরা নিজের অজান্তে গুন গুন করে গাইতাম লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন’, কিংবা ‘ও পলাশ ও শিমুল আমায় কেন এত রাঙালে’।
ষষ্ঠীর দিন প্রতিমা আনার পর ঢাকের শব্দ পুরো এলাকায় আলাদা আমেজ তৈরি করত। মণ্ডপে ঢাক বাজাতেন রেলওয়ে পাড়ার বাবুল দাশ। তিনি রেলওয়েতে চাকরি করতেন এবং অবসর সময়ে কমার্শিয়াল থিয়েটার করতেন।
কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তির পর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আমি, সুজিত, রনি, অরূপ একসঙ্গে বসতাম, চলতাম, টিফিনও খেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগপর্যন্ত আমাদের এই সখ্য অটুট ছিল। বিশেষ করে অরূপের সঙ্গে।
রাজা আর অরূপ দুজনেই থাকত দক্ষিণ নালাপাড়ায়। আমার দুই ঈদই কাটত অরূপের সঙ্গে। আর পূজা এলে আমিও নালাপাড়া ছেড়ে আসতে পারতাম না। পরে কলেজে উঠে ওই পাড়ার উত্তম, জুয়েলসহ আরও অনেক বন্ধু জুটে যায়। দিনভর আড্ডা, ঢাকের বোলের সঙ্গে উদ্দাম নাচ, খাওয়াদাওয়া সবখানে আমিও ছিলাম শতভাগ।
দুর্গাপূজা শেষ হয়ে গেলেও তার রেশ থেকে যায় লক্ষ্মীপূজা অর্থাৎ কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত। লক্ষ্মীপূজার সময় এলেই মনে পড়ে নাড়ুর কথা। একবার বেড়াতে গিয়েছি চাঁদপুরের শ্বশুরবাড়িতে। স্ত্রী-পরিজন নিয়ে লক্ষ্মীপূজার আমন্ত্রণ ছিল শ্বশুরবাড়ির পাশের পালপাড়ায়। সেখানে চার-পাঁচটি বাড়িতে নাড়ু খেতে হলো।
রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনির দুর্গাপূজার আনন্দের সুর কেটে গিয়ে বিষাদের মুহূর্ট তৈরি হতো দশমীর দিন। সেদিন বিকেলের দিকে ট্রাক এসে দাঁড়াত কলোনির মাঠের এক কোণে। সেখান থেকে একদল কাঁধে করে প্রতিমা ওঠাতেন ট্রাকে। প্রতিমার পেছন পেছন অসংখ্য শিশু-কিশোর, তরুণ। সবার ‘কণ্ঠে দুর্গা মা কি জয়’ ধ্বনি। সব প্রতিমার নাম নিত তারা। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। জয়ধ্বনি থেকে বাদ পড়ত না অসুরও।




















