ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’ মার্স রোভার চ্যালেঞ্জে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। ২৭-৩০ মে যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ স্টেটের হ্যাঙ্কসভিলে অবস্থিত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে (এমডিআরএস) অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত পর্বে বিশ্বের ১৫টি দেশের ৩৮টি দল অংশ নিয়েছিল।
২০২২ সালে প্রথমবার অংশ নিয়েই ইউটাহর মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিল ইউআইইউর শিক্ষার্থীদের দল। সেবার ১৩তম হওয়া ইউআইইউর ছেলেমেয়েরা নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কাজ শুরু করে। ধীরে ধীরে কাজের পরিসর বড় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমর্থনে তাঁরা ধাপে ধাপে ভালো ফলাফল করেছে। ২০২২ সালে বিশ্বে ১৩তম, ২০২৩ সালে নবম, ২০২৪ সালে পঞ্চম, ২০২৫ সালে ষষ্ঠ, আর এবার তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে।
এ বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। দ্বিতীয় অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি। এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে সেরা তিনে স্থান করে নিয়েছে ইউআইইউ। ‘বেস্ট অটোনমাস সিস্টেম’ স্বীকৃতিও তাঁদের।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ইউআইইউর দলে সদস্যসংখ্যা ৩২। নেতৃত্বে ছিলেন সাইফ আল সাদ (টিম লিড), মো. মুশফিকুর রহমান (সিনিয়র লিড) এবং শেখ সাকিব হোসেন (কো-টিম লিড)। পরামর্শক হিসেবে পাশে ছিলেন স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক হাসান সারওয়ার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সুমন আহমেদ। দলের মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন একই বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসেন।
এ বছর ইউআইইউর রোভারের নাম রাখা হয়েছিল অরিয়ন। গ্রিক ভাষায় শব্দটির অর্থ ‘নতুন ভোর’ বা নতুন শুরু। দলটি সত্যিই এ বছর সব নতুন করে শুরু করেছিল। পুরো সফটওয়্যার আর হার্ডওয়্যার আর্কিটেকচার ছেঁটে ফেলে একেবারে গোড়া থেকে তৈরি করা হয়েছে নতুন সিস্টেম।
এই বছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসেছিল একেবারে শেষ সময়ে। স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন মিশন শুরু হওয়ার পর ইউআইইউ মার্স রোভার দল টের পায়, আইএমইউ (ইন্টারনাল মেজারমেন্ট ইউনিট, যা রোভারের অবস্থান আর দিকনির্ণয় করে) কাজ করছে না। হোটেল থেকে ফিল্ডের দূরত্ব প্রায় ৭০ মাইল, রাস্তাও ভাঙাচোরা। যাওয়ার পথেই হয়তো কোনোভাবে আইএমইউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সমস্যা বুঝে নতুন আইএমইউ লাগিয়ে, নতুন করে প্রোগ্রাম করতে চলে যায় ১৫ মিনিট। হাতে বাকি তখন মাত্র ২৫ মিনিট। তারপর শুরু হয় মিশন। রোভারকে কোনো মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মরুভূমির ভেতর নিজে নিজে পথ খুঁজতে হবে, বাধা এড়াতে হবে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে হবে—সব সিদ্ধান্ত রোভারের নিজের।
একে একে সব ধাপ সামলেছে অরিয়ন। সময় শেষ হওয়ার চার সেকেন্ড আগেই এটি চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে। উপস্থিত সবাই তো বটেই, বিচারকেরাও অবাক—এত কম সময়ে এটা কীভাবে সম্ভব! সাতটি লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছয়টিতে পৌঁছে সর্বোচ্চ ৮৪ নম্বর পেয়ে অরিয়ন জিতেছে ‘বেস্ট অটোনমাস সিস্টেম’ পুরস্কার।
সিনিয়র লিডার মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সবাই লাফিয়ে উঠি। এত মানুষের পরিশ্রম, ত্যাগ আর অপেক্ষা—সবকিছু যেন এক ঘোষণাতেই সার্থক হয়ে গেল।’
তৃতীয় হওয়ায় কি দলটি সন্তুষ্ট? উত্তর সহজ নয়। পরীক্ষার মধ্যে, উৎসবের দিনেও, রাতের পর রাত জেগে ল্যাব ছাড়েননি তাঁরা। একেকটি ভুল সংশোধন করে, একে একে সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এই অর্জন শিক্ষার্থীদের কাছে গর্বের বটে, তবে স্বপ্নটা আরও বড়। দলের মেন্টর আবিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের সেরাটা দিয়েছি। তবে এখানেই থামতে চাই না। আমাদের লক্ষ্য একটাই, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া।’





























