মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে স্কুলকে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের কাছে স্কুল হতে হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা দিন দিন স্কুলবিমুখ হয়ে পড়ছে। স্কুলে না যাওয়া বা স্কুল পালানোটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। এতে করে বেড়ে যাচ্ছে তাদের প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং–নির্ভরতা। অভিভাবকদের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসছে বাড়তি খরচের এক ভয়াবহ বোঝা। এর কারণ কী? এর পেছনে অনেক বিষয় জড়িত। সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, আকাশ–সংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদি তো আছেই, পাশাপাশি আমাদের স্কুল ব্যবস্থাপনাগত বা পাঠদানসংক্রান্ত কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে। কারণ, যত সমস্যার কথাই বলি না কেন, আমাদের সন্তানদের স্কুলমুখী করার কোনো বিকল্প নেই। তাই সমস্যাটির সমাধান করতেই হবে। অন্তত আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই।
অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন
অবকাঠামোকে অবশ্যই সুন্দর ও আকর্ষণীয় করতে হবে। কোনো রকমে একটা স্কুলঘর দাঁড় করালেই হবে না। সম্পূর্ণ স্কুলটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে। আমাদের দেশে বিষয়টি অনেকটাই অবহেলিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনোরূপ পরিকল্পনা ছাড়াই স্কুল স্থাপিত হয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় অনেক কিছুর যেমন অভাব থাকে, তেমনি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশও সেখানে থাকে না। ফলে সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীরা আনন্দময় কোনো পরিবেশ পায় না। এমনিতেই পড়াশোনা একটি বিরক্তিকর ব্যাপার। তার ওপর আনন্দময় পরিবেশ যদি না থাকে, তবে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখাটা খুব কঠিন। তাই পুরো স্কুলটি সাজানোর ক্ষেত্রে প্রতিটি স্কুলের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান থাকা দরকার। স্কুলের কোথায় কী থাকবে, তা এই মাস্টারপ্ল্যানে থাকতে হবে।
শ্রেণিকক্ষ সজ্জিত করতে হবে
শ্রেণিকক্ষটা সুন্দরভাবে সাজানো গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষটা আকর্ষণীয় হলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসের প্রতি আকৃষ্ট হবে। শ্রেণিকক্ষ যে কত সুন্দরভাবে সাজানো সম্ভব, সেটা দেখেছিলাম ২০১০ সালে আমেরিকায় টি ই এ প্রোগ্রামে গিয়ে। সেখানে ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে লিংকন শহরের নর্থস্টার হাইস্কুলে আমার দুই সপ্তাহ শ্রেণিপাঠদান কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। ওখানে শ্রেণিকক্ষগুলো শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি দ্বারা অসাধারণভাবে সাজানো, যার ফলে ক্লাস নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক খুব সহজেই সব সামগ্রী হাতের কাছে পেয়ে যান।
প্রধান শিক্ষকদের ভূমিকা
শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারেন প্রধান শিক্ষকেরা। আমার বিশ্বাস, একজন প্রধান শিক্ষকের কার্যক্রমে যদি সততা ও স্বচ্ছতা থাকে এবং তিনি যদি নেতৃত্বগুণসম্পন্ন হন, তবে তাঁর পক্ষে স্কুল চালানো অনেকটাই সহজ। তাঁর পক্ষে সবার সহযোগিতায় স্কুলে শিক্ষাবান্ধব একটি পরিবেশ গড়ে তোলাও খুবই সম্ভব। একটা কথা খুব ভালো করে মাথায় রাখতে হবে যে শিক্ষার্থীদের সব রকমের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা তাঁর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে এই দায়িত্বপালন থেকে তাঁর পিছু হটার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
শিক্ষকদের প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষার্থীদের স্কুলে আকৃষ্ট করার ব্যাপারে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন আমাদের শিক্ষকেরা। আমার ধারণা, শিক্ষকদের প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে মন্ত্রের মতো কাজ করতে পারে। তবে দু–একজনের চেষ্টায় তেমন কিছু হবে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে দরকার সম্মিলিত ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। আরেকটি কথা, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে শিক্ষকের পাঠদান আকর্ষণীয় হয়, তাঁর ক্লাস শিক্ষার্থীরা এখনো মনযোগ দিয়ে শোনে। তাঁর ক্লাসের জন্য তারা আগ্রহভরে অপেক্ষা করে থাকে। আর একটা সুন্দর ক্লাসের জন্য দরকার ভালো প্রস্তুতি। ন্যূনতম প্রস্তুতি ছাড়া ভালো ক্লাস নেওয়া কীভাবে সম্ভব?
প্রক্সি ক্লাসের ব্যবস্থা চালু করা দরকার
মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রক্সি ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা। কোনো শিক্ষক স্কুলে উপস্থিত না থাকলে অন্যদের মাধ্যমে তাঁর ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা এটি। অনেক সময় এ ধরনের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের তেমন কোনো কাজ হয় না বললেই চলে। আমেরিকার স্কুলে আমি দেখেছি, প্রক্সি ক্লাসের জন্য নিয়মিত শিক্ষকদের বাইরে কিছু নিবন্ধিত শিক্ষক আছেন। কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিবন্ধিত শিক্ষককে দিয়ে ছুটিতে থাকা শিক্ষকের ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যিনি ক্লাস নেওয়ার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আসেন এবং তাঁর ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব উপকৃত হয়। আমাদের দেশেও এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। সীমিতসংখ্যক স্কুলে হলেও এটা চালু করে দেখা যায়।






























