সাইফ আলী খান অভিনীত নতুন নেটফ্লিক্স সিনেমা 'কর্তব্য' এক ছোট শহরের পুলিশ কর্মকর্তার গল্প নিয়ে। পরিচালক পুলকিতের এই রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ এবং কারিগরিভাবে পরিণত ক্রাইম থ্রিলারে সাইফের অভিনয় দারুণ। তাঁর অভিনয়ে ক্ষোভ, হতাশা আর প্রতিরোধের যে মিশ্র প্রকাশ দেখা যায়, সেটিই সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
সিনেমার শুরুতেই দেখা যায়, ৪০তম জন্মদিনেও দায়িত্বে ব্যস্ত থানার কর্মকর্তা পবন (সাইফ আলী খান)। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এক নারী সাংবাদিক ও তার টিমকে নিরাপত্তা দেওয়ার। ওই সাংবাদিক শহরের প্রভাবশালী ধর্মগুরু আনন্দ শ্রীর (সৌরভ দ্বিবেদী) বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করতে এসেছে। কিন্তু সাধারণ দায়িত্ব মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হয়, আর পবনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী অশোক (সঞ্জয় মিশ্র) গুলিবিদ্ধ হয়। হামলাকারী একজন কিশোর। এরপরই বিপাকে পড়ে পবন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (মনীশ চৌধুরী) তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে চায়। নিজের সম্মান বাঁচাতে পবন এক সপ্তাহ সময় চায়। তদন্ত শুরু করার আগেই সে জানতে পারে, তার ছোট ভাই নিখোঁজ! ধারণা করা হচ্ছে, অন্য জাতের এক মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে সে! দুটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পবন আবিষ্কার করে, এই লড়াইয়ে তিনি একেবারেই একা।
এই হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে ব্যর্থতার পরই পবনের বিবেক জাগ্রত হয়। যে কাজটি একজন সাংবাদিকের করার কথা ছিল, সেটাই এবার করতে বাধ্য হয় এক পুলিশ কর্মকর্তা। ফলে 'কর্তব্য' শুধু একটি তদন্তভিত্তিক থ্রিলার নয়; বরং এটি এমন এক গল্প, যেখানে চাকরির দায়িত্ব আর নৈতিক দায়িত্ব একসময় আলাদা হয়ে যায়। দুটি ছবির আরও একটি মিল হলো—রাতের অন্ধকার যেন এখানে আলাদা এক চরিত্র। আর দুটিতেই অনবদ্য অভিনয় করেছেন সঞ্জয় মিশ্র, বিশ্বস্ত সহকর্মীর ভূমিকায়।
হিন্দি সিনেমায় 'কর্তব্য' শব্দটি সাধারণত প্রতিশোধ, পারিবারিক সম্মান বা পুরোনো মূল্যবোধ রক্ষার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু পুলকিত এই ধারণাকে উল্টে দিয়েছেন। এখানে চল্লিশোর্ধ্ব নায়ক পবন লড়াই করে পরিবারতন্ত্র, সামাজিক রক্ষণশীলতা আর সেকেলে প্রথার বিরুদ্ধে। এই ছবিতে প্রতিশোধ মানে অতীত রক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের সূত্র তৈরি করে সিনেমাটি দেখায়, সমাজে ট্রিগার টানা মানুষটির বিচার হয়, কিন্তু বন্দুকের মালিকেরা থেকে যায় ধরা–ছোঁয়ার বাইরে।
পুলকিত এখানে এমন এক সামাজিক গল্প বলতে চেয়েছেন, যা অনেকটা সুধীর মিশ্র বা অনুরাগ কাশ্যপের রাজনৈতিক সিনেমার ধাঁচের। তবে এটি কেবল তদন্তমূলক থ্রিলার নয়। কারণ, দর্শক শুরু থেকেই জানে যে ক্ষমতার শিকড় কোথায়। বরং এটি এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে নির্লিপ্ত মানুষদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। পবনও প্রথমে উদাসীন ছিল—যতক্ষণ না ঘটনাগুলো তার নিজের জীবনে আঘাত হানে।
চিত্রনাট্যের সূক্ষ্মতা ছবিটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। যদিও মাঝেমধ্যে ভয়েসওভার বা অতিরিক্ত সংলাপের মতো ওটিটি-ধর্মী কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তবু লেখার বুদ্ধিদীপ্ততা চোখে পড়ে। সাইফ আলী খান বরাবরের মতোই আকর্ষণীয়। এটাই প্রথমবার নয় যে সাইফ উত্তর ভারতের রুক্ষ বাস্তবতায় অভিনয় করলেন। 'ওমকারা'-তে তাঁর ল্যাংড়া ত্যাগী চরিত্র আজও সিনেমাভক্তদের মনে থাকার কথা। সেই চরিত্রের আঞ্চলিক ভাষা, শরীরী ভঙ্গি এবং নির্মমতা ছিল থিয়েট্রিক্যাল–জগতের ভেতরেও বিশ্বাসযোগ্য। একইভাবে 'স্যাক্রেড গেমস' সিরিজেও পুলিশের চরিত্রেও দুর্দান্ত করেছিলেন।
'কর্তব্য' সিনেমায় সাইফের সংলাপের টানে কখনো অতিরিক্ত পুরুষালি ভঙ্গি এলেও চরিত্রটির ভেতরের অস্থিরতা তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পবন চরিত্রটি যেন ভেতরে–ভেতরে ফুটতে থাকা এক আগ্নেয়গিরি। তার রাগ, হতাশা আর পিতৃত্ববোধ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক নায়ক, যে একই সঙ্গে ভঙ্গুর ও ভয়ংকর। এই চরিত্র কিছুটা মনে করিয়ে দেয় কিছুদিন আগেই অ্যামাজন প্রাইমে মুক্তি পাওয়া 'সুবেদার' সিনেমার অনিল কাপুরকে—যে ছোট শহরের রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে একা লড়েছিল। তবে অনিল কাপুর যেখানে মাথা উঁচু করে বাঁচার দাবি তুলেছিলেন, সেখানে সাইফ আলী খানের পবন যেন অন্য কথা বলে—আবার সত্যিকারের বাঁচতে হলে আগে কিছুটা মরতে জানতে হবে।






























