জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে ছাত্রীরা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি। চারজনের জন্য বরাদ্দ কক্ষে থাকছেন আটজন, রিডিং রুমে আসন মাত্র ৯০টি। সুপেয় পানির অভাব, ধীরগতির ইন্টারনেট, গ্যাস-সংকট ও খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, হল চালু হওয়ার চার বছরেও এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি।
হলের বর্তমান নাম নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর প্রথমবার হলটি উদ্বোধন করা হয়। তখন এর নাম ছিল বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল। পরে ২০২২ সালের ১৬ মার্চ আবারও উদ্বোধন করা হয় হলটি। এর পরদিন ১৭ মার্চ শিক্ষার্থীরা হলে ওঠেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ২৪ জুন হলের নাম পরিবর্তন করা হয়।
হল সূত্র বলছে, হল থেকে দেওয়া স্টিলের বিছানার সঙ্গে অতিরিক্ত সরু বেড জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবেই ‘গাদাগাদি’ করে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাদের অভিযোগ, এতে একদিকে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনার পরিবেশ, তেমনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘনিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, আটজন ছাত্রীর বিপরীতে কক্ষগুলোতে পড়ার জন্য টেবিল রয়েছে মাত্র চারটি। একজন পড়তে বসলে অন্যজনের জায়গা হয় না। বাধ্য হয়ে অনেককে রিডিং রুমে যেতে হয়। কিন্তু সেখানেও পর্যাপ্ত আসন নেই। হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য সেখানে আসন রাখা হয়েছে মাত্র ৯০টি।
হল সূত্র বলছে, প্রতিটি ফ্লোরে গড়ে এক শর বেশি শিক্ষার্থী থাকেন। অথচ খাওয়ার পানির ফিল্টারে কল রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে পানির জন্যও একরকম লাইনে দাঁড়াতে হয়। আবার যখন ফিল্টারের কিট পরিবর্তন করার সময় আসে, তখন অন্য ফ্লোরে গিয়ে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয় শিক্ষার্থীদের।
হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খাবারের পরিমাণ কম এবং মানও সন্তোষজনক নয়। ফলে অনেকেই বাইরে থেকে বাজার এনে নিজে রান্না করেন। কিন্তু সেখানেও ভোগান্তি কম নয়। প্রতিটি ফ্লোরে চুলা রয়েছে মাত্র চারটি। আবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ কম থাকে। রাতে গ্যাসের প্রবাহ বাড়লে রান্নার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শৌচাগার ও গোসলখানা নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। অনেক সময় ময়লা জমে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এদিকে হলে নেই কার্যকর কোনো মেডিক্যাল সেবাব্যবস্থাও।
হলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের সূত্র বলছে, পুরো হলের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র দুজন গার্ড। সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও অনেকগুলো অকার্যকর। ফলে আবাসিক ছাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
১৬ তলার এই হলে রয়েছে মাত্র চারটি লিফট। এর মধ্যে দুটি বড় এবং দুটি ছোট। সব সময় সব লিফট সচল থাকে না। কখনো দুটি চালু থাকলে বাকি দুটি বন্ধ রাখা হয়। মাঝেমধ্যে লিফট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিহা ইসলাম প্রথম আলো কে বলেন, ‘প্রশাসনকে বারবার বলার পরও লিফট সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে হয়তো সমস্যার সমাধানও হবে না।’
ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে একাডেমিক কার্যক্রমেও সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও গবেষণার কাজে বারবার ভোগান্তিতে পড়ার কথা জানান তাঁরা। হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি রুমে নতুন রাউটার বসানো হয়েছে দাবি করা হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলছেন শিক্ষার্থীরা।
হলে থাকা শিক্ষার্থীরা বলছেন, সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ বিষয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল সংসদের সহসভাপতি জান্নাতুল উম্মে তারিন প্রথম আলো কে বলেন, ‘হলের সমস্যার পরিমাণ অনেক। সমাধানের প্রক্রিয়ায় যেতে সময় লেগে যায়। নতুন প্রশাসনের কাছে ছাত্রীরা দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছে।’
হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক সুমাইয়া তাবাসসুম বলেন, ‘হলে এমনিতেই ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। যাঁদের সত্যিই প্রয়োজন, তাঁদেরই যেন হলে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে খাবারের মান উন্নয়ন ও মেডিক্যাল সেন্টার স্থাপন জরুরি।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হলের প্রাধ্যক্ষ আনজুম আরার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রথম আলো । তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হলের ব্যাপক উন্নতি করেছেন। তিনি বলেন, ‘হলের অডিটোরিয়াম সংস্কারের জন্য প্রশাসন তথ্য চেয়েছে, আমরা পাঠিয়েছি। প্রশাসন থেকে বরাদ্দ আসায় হলের খাবারের দাম কমানো হয়েছে। মেডিক্যালের জন্য রুম আছে, কিন্তু ডাক্তার বা নার্স নেই। এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি অন্তত কিছু ওষুধ এনে যাতে ছাত্রীদের সহায়তা করা যায়। অন্যান্য সব বিষয়ে উপাচার্য তাগিদ দিয়েছেন কাজ করার। বরাদ্দ পেলেই এসব বিষয়ে কাজ করা সম্ভব।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে পাল্টা অভিযোগ করে আনজুম আরা বলেন, হলের মধ্যে গ্রুপিংয়ের রাজনীতি চলে, অস্থিরতা আছে, কার দুর্বলতা আছে—এসব নিয়ে আছে মাতামাতি।






























