জাতীয় পার্টি (জাপা) একসময় দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। বড় দুই দলের ক্ষমতার সমীকরণেও অনেক ক্ষেত্রে দলটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ সখ্য, বিতর্কিত নির্বাচনগুলোয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্বসংকট ও বারবার ভাঙনের ধাক্কায় সেই অবস্থান এখন গেছে হারিয়ে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি কোনো আসন পায়নি; এমনকি দলটির রংপুরের মতো ঘাঁটিতেও প্রভাব ভেঙে পড়েছে। ফলে জাতীয় পার্টির সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দলটি আবার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জাতীয় পার্টির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অনেকে মনে করেন, ভোট এবং মাঠের রাজনীতিতে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। কারণ, দলটির নিজস্ব কোনো কর্মিবাহিনী নেই। সমর্থকগোষ্ঠীও বিভিন্ন দলে ভিড়ে গেছে। নতুন করে দলকে দাঁড় করানোর মতো নেতৃত্বও নেই। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় পার্টিকে এখন ছোট দলের কাতারেই দেখা হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির এই বিপর্যয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে রংপুরে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের আবেগ দীর্ঘদিন রংপুর অঞ্চলে দলটিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় হয়েছেন। একসময় যে অঞ্চলে জাতীয় পার্টি ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, সেখানে দলটির প্রার্থী এখন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীও নন। এই ফলাফল দেখিয়েছে, জাতীয় পার্টির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকও আর আগের মতো অটুট নেই।
জাতীয় পার্টির বর্তমান বিপর্যয়ের বড় কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক সখ্যকে সামনে আনছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলটির বর্তমান ও সাবেক নেতাদের অনেকে। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির সমর্থন ছিল। এরপর ২০০৮ সালে মহাজোটের অংশ হওয়া এবং পরে বিতর্কিত তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা, ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে সংসদে থাকা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় পার্টি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে।
জাতীয় পার্টির নেতাদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিয়ে জাতীয় পার্টি ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হিসেবে জাতীয় পার্টি চাপে ছিল। আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে পরিচিত হলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভোটাররাও এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির পাশে থাকেননি—এমন মূল্যায়নও আছে দলটির ভেতরে।



















