বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিএনপি সরকারঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে তিনটি বড় বাধার কথা বলেছে। এগুলো হলো—গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়; লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ বাধাগুলোর কথা জানান।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সম্পর্কে জামায়াতের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার জন্য এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। এক নম্বর বাধা—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়। সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত তিন মাসে গ্যাস, জ্বালানির দাম দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের দামও বেড়েছে।
বাজেট বাস্তবায়নে দ্বিতীয় বড় বাধা লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি’ বলে উল্লেখ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, এ ছাড়া অপর বড় বাধাটি হলো—বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
এই তিনটি বড় বাধার কারণে বাজেট বাস্তবায়নসহ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সরকারের জন্য ‘খুব কঠিন’ হয়ে দাঁড়াবে বলে মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
প্রস্তাবিত বাজেটের ‘সবচেয়ে বড় দুর্বলতা’ হিসেবে ঘাটতির অঙ্ককে চিহ্নিত করেছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমবে, যা কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে দলটি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনের বাস্তবসম্মত রূপরেখা নেই। রাজস্ব আদায়ের যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে, সেখানে যে করকাঠামো ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন, সেগুলোর উল্লেখ নেই। কর প্রশাসনে সংস্কার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে, এমন উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
কর বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার ভাষাগত কৌশলে আড়ালের চেষ্টা করেছে বলেও মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার।
৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে ‘চটকদার সিদ্ধান্ত’ বলে প্রতিক্রিয়া জানান জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসের সঙ্গে এ লক্ষ্যমাত্রার সামঞ্জস্য নেই। বর্তমান ভঙ্গুর বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক নীতি, ব্যাংকিং খাতে অন্যায্য হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে।
ব্যক্তিগত করের সর্বনিম্ন হার ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে জামায়াতে ইসলামী বলছে, এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ বাতিলের আহ্বানও জানিয়েছে দলটি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে তিন লাখ কোটি টাকা করা হলেও তা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন গোলাম পরওয়ার।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের টাকা লুটপাট করে, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হাতে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ যে ফ্যাসিবাদী পথ দেখিয়ে গিয়েছিল, বর্তমান সরকারও যদি সে পথেই হাঁটে, তাহলে পরিস্থিতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না।
জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণ প্রত্যাশা অনুযায়ী জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট পায়নি বলে মন্তব্য করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল।
সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে এই বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতি হবে, দলীয় কর্মীদের মধ্যে টাকা ভাগ–বাঁটোয়ারা, লুটপাটের আয়োজন হিসেবে বাজেট পরিগণিত হবে। এ কারণেই সরকার গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে না।
সার্বিকভাবে ‘উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটে সহায়ক’ বাজেট সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব ও জনকল্যাণমূলক বাজেট প্রস্তাবের আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম, ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।




















