৪৫ বছর আগে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের নিস্তব্ধতা ভেঙে যায় মেশিনগানের গুলিতে। সেখানে অবস্থান করছিলেন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। আগের দিন তিনি চট্টগ্রামে এসেছিলেন দলের স্থানীয় বিরোধ মেটাতে। ভোর হওয়ার আগেই সেই সফর পরিণত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ে।
জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম সফর ছিল হঠাৎ নির্ধারিত। জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী তাঁর বইয়ে লিখেছেন, জিয়া প্রায় প্রতি মাসেই চট্টগ্রাম সফর করতেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর চট্টগ্রাম হয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সেনাক্যাম্প পরিদর্শন তাঁর নিয়মিত কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে ১৯৮১ সালের মে মাসের শেষ সফরটি ছিল আলাদা।
রাষ্ট্রপতির সফরের মূল কারণ ছিল চট্টগ্রাম বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ। স্থানীয় নেতৃত্ব দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক পক্ষের পেছনে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদ, আরেক পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছিলেন ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরী। দলীয় বিরোধ এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে স্থানীয় কর্মীরা সংঘর্ষে জড়াতেন, শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিঘ্নিত হতো।
১৯৮১ সালে ২৯ মে সকালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে জিয়াউর রহমান প্রথমে যান সার্কিট হাউসে। এরপর চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে ফিরে এসে সার্কিট হাউসে বিএনপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠক শুরু হয় বেলা তিনটার দিকে। সন্ধ্যা পেরিয়েও তা চলছিল। সেটিই ছিল চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানের শেষ রাজনৈতিক বৈঠক।
সার্কিট হাউসে হামলা ছিল দ্রুত, সংগঠিত ও ভয়াবহ। সরকারি ভাষ্যে বলা হয়, ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয় দেওয়া কিছু বিদ্রোহী সেনাসদস্য রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেছেন। চট্টগ্রাম বেতার থেকে মঞ্জুরের বরাত দিয়ে জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়ার খবর প্রচারিত হয়। মঞ্জুর নিজেকে ‘বিপ্লবী পরিষদের’ একমাত্র মুখপাত্র বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম বেতার থেকে এই ঘোষণা প্রচারের আগপর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের অনেকেই নিশ্চিতভাবে জানতেন না, আসলে কী ঘটেছে। রেডিওতে ঘোষণার পর পুরো চট্টগ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সান্ধ্য আইন জারি হয়। ঢাকার সঙ্গে টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সড়ক ও আকাশপথও বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশের কেন্দ্রীয় শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ঢাকায় তখন দ্রুত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা শুরু হয়। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ও তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদসহ সামরিক নেতৃত্ব সাত্তার সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। ৩০ মে দুপুরে বিচারপতি সাত্তার রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। সভা-সমাবেশ, মিছিল ও গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর পর সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন ছিল—জিয়াউর রহমানের মরদেহ কোথায়? সার্কিট হাউসে সকালে যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁরা মরদেহ দেখেছিলেন। পরে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল সার্কিট হাউসে এসে জিয়াউর রহমানসহ অন্তত তিনজনের মরদেহ গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে মরদেহ গোপনে রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হয়।
মঞ্জুরের পলায়ন এবং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী লিখেছেন, তাঁরা জানতে পারেন জিয়ার মরদেহ সেনানিবাসে নেওয়া হয়নি। রাঙ্গুনিয়া থানার পুলিশ খবর দেয়, বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানির কাছে একটি খালি জায়গায় রাতে সেনাসদস্যরা একটি মরদেহ দাফন করেছেন। স্থানীয় একজন মৌলভি লাশ কার, তা না জেনেই দাফনে সহায়তা করেছিলেন। পরে জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়ালে স্থানীয় লোকজন সন্দেহ করে পুলিশকে জানান। কবর খুঁড়ে দেখা যায়, সেটি জিয়াউর রহমানের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ।
উদ্ধারের পর জিয়াউর রহমানের মরদেহ সরাসরি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জিয়াউদ্দিন, বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন ও পুলিশ সুপার মারুফ সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। তাঁরা সেনানিবাসে গিয়ে দেখেন, ভেতরেও আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। প্রধান ফটকে কোনো প্রহরা নেই। কর্মকর্তাদের অনেকেই বিভ্রান্ত, কেউ কেউ জানতে চায়, কী হয়েছে।




















