রাখিবন্ধন উৎসব মানবতার উৎসব, যেখানে ভেদাভেদ ভুলে ভাই-বোনের সৌভ্রাতৃত্বের আদর্শ বজায় থাকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে উদ্যাপন করেছিলেন।
ভারতীয় পুরাণে রাখিবন্ধনের ইতিহাস আলাদা। ভবিষ্যপুরাণে এ সম্পর্কে একটি কাহিনি আছে। স্বর্গপুরীতে দৈত্যরাজ বলির উপদ্রব থামাতে দেবরাজ ইন্দ্র যুদ্ধে নেমেছিলেন। শচী দেবী ইন্দ্রের হাতে রক্ষাবন্ধনী বেঁধে দিয়েছিলেন।
রাখিবন্ধনের আরেকটি কাহিনি বিষ্ণুপুরাণে রয়েছে। সেখানে বিষ্ণুদেব দৈত্যরাজ বলির সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিলেন। মা লক্ষ্মী বলির হাতে রাখি বেঁধে দিয়েছিলেন, যা বিষ্ণুকে বাস্তুচ্যুত করে ছাড়ার জন্য বলিকে রাজি করিয়েছিল।
রাখিবন্ধনের আরও একটি ঐতিহাসিক কাহিনি রয়েছে চিতোরের প্রেক্ষাপটে। ১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে চিতোরের রাণী কর্ণাবতী মোগল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে সাহায্য প্রার্থনায় রাখি পাঠিয়েছিলেন। হুমায়ুন রাখি পরে চিতোরের দিকে অগ্রসর হলেও সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি।
মহাভারতে রাখি নিয়ে একটি প্রচলিত কাহিনি আছে। যুদ্ধে কৃষ্ণের হাতে আঘাত হলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল থেকে কাপড় ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে ভগিনী জ্ঞানে সম্মান করতেন।
বর্তমানকালে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ও প্রান্তে দেখা যায় শুধু ভাই-বোনের মধ্যেই রাখি পরানোর ঝোঁক। রাখিপূর্ণিমার দিন বোনেরা ভাইদের হাতে একটি পবিত্র সুতা বেঁধে দিয়ে মঙ্গল কামনা করে থাকেন। হিন্দুদের পাশাপাশি জৈন, বৌদ্ধ ও শিখরাও রাখিবন্ধন উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।
আধুনিক কালে দেশে দেশে মানুষে মানুষে এত বিরোধ-বিভেদের মধ্যে যদি জাতি-ধর্মনির্বিশেষে গভীর সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীকী এই বৈশিষ্ট্যকে রাখিবন্ধনের মাধ্যমে ভাই-বোনের ছোট্ট পারিবারিক বৃত্তের বাইরে বৃহত্তর সমাজে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে মানবসভ্যতার বিকাশে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নিশ্চিতভাবেই হ্রাস পাবে।




















