ফরাসি-মরিশিয়ান পারকাশনবাদক ও সুরকার সুভাষ ধনুচন্দের নেতৃত্বে ফেত দ্য লা মিউজিক উৎসবে তবলা ও ইলেকট্রনিক সংগীতের অদ্ভুত সমন্বয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। উৎসবের প্রথম দুই দিনে দর্শকদের দারুণ উপস্থিতি দেখা গেছে।
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা এবং তাদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিল্প-সহযোগী প্রতিষ্ঠানের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব। আয়োজকদের ভাষ্য, সংগীতের মাধ্যমে সংস্কৃতির সেতুবন্ধ তৈরি করাই এ উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন ফরাসি-মরিশিয়ান পারকাশনবাদক ও সুরকার সুভাষ ধনুচন্দ। তবলার ঐতিহ্যবাহী ধ্বনি এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক সংগীতকে এক সুতোয় গাঁথার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত। তাঁর বহুল আলোচিত প্রকল্প ‘তবলাট্রনিক’ সমকালীন ফিউশন সংগীতজগতে একটি স্বতন্ত্র নাম।
উৎসব শুরু হয় গত বুধবার ধানমন্ডির বাটারনোট জ্যাজ ক্যাফেতে আয়োজিত একটি ইলেকট্রনিক মিউজিক কর্মশালার মাধ্যমে। সুভাষ ধনুচন্দের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা ইলেকট্রনিক সংগীত নির্মাণ, রিদম প্রোগ্রামিং, লাইভ ইম্প্রোভাইজেশন এবং সমকালীন পারফরম্যান্স কৌশল সম্পর্কে হাতে–কলমে ধারণা পান।
কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন, এমন বেশ কয়েকজনের মতে, শুধু শেখার সুযোগ নয়, কর্মশালাটি ছিল একধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রও। সংগীতশিল্পী ও শিক্ষার্থীরা এমন একজন শিল্পীর সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগীত ও প্রযুক্তির সংযোগস্থলে নতুন নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধান করে চলেছেন।
উৎসবের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত আয়োজন ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন গ্যেটে ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ‘তবলাট্রনিক’-এর লাইভ পরিবেশনা। সন্ধ্যা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শকে ভরে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। আয়োজকদের মতে, পরীক্ষাধর্মী ও আন্তসাংস্কৃতিক সংগীতের প্রতি বাংলাদেশের শ্রোতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে—এ আয়োজন তারই প্রমাণ।
মঞ্চে উঠে সুভাষ ধনুচন্দ যেন দর্শকদের নিয়ে গেলেন অন্য এক সংগীতভুবনে। তবলার তালের সঙ্গে তিনি মিশিয়ে দিলেন নিজের বানানো ইলেকট্রনিক সাউন্ডস্কেপ। কখনো দ্রুত ছন্দের ঝংকার, কখনো ধীর ও আবেশময় সুরের বিস্তার, আবার কখনো তাৎক্ষণিক সৃজনশীল ইম্প্রোভাইজেশন—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ভিন্নধর্মী পরিবেশনা। লাইভ পারকাশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতার সমন্বয়ে পুরো পরিবেশনায় ছিল নতুনত্বের ছাপ। দর্শকেরা আনন্দ নিয়ে উপভোগ করেন এ পরিবেশনা।
পরিবেশনার একপর্যায়ে মঞ্চে যোগ দেন বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ জাকির হোসেন। শুরু হয় দুই শিল্পীর যৌথ পরিবেশনা। জাকির হোসেনের হাতে ছিল বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকবাদ্য একতারা। একতারার মাটির গন্ধমাখা সুর, বাংলা লোকসংগীতের আবহ এবং সুভাষ ধনুচন্দের তবলারের প্রাণবন্ত ছন্দ মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অনন্য সংগীত সংলাপ।
আয়োজকেরা মনে করছেন, এই পরিবেশনাই ফেত দ্য লা মিউজিকের মূল দর্শনকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। কারণ, এখানে একই সঙ্গে জায়গা পেয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সমকালীন সৃজনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সেই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, নতুন চিন্তা ও সৃজনশীল মেলবন্ধনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে কীভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা যায়।
অনুষ্ঠানজুড়ে দর্শকদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবেশনা শেষে দীর্ঘ করতালি আর উচ্ছ্বাসে শিল্পীকে অভিনন্দন জানান উপস্থিত শ্রোতারা। আয়োজকদের মতে, উৎসবের প্রথম দুই দিনের সবচেয়ে আলোচিত ও স্মরণীয় আয়োজনগুলোর একটি হয়ে উড়েছে এই ‘তবলাট্রনিক’ পরিবেশনা।



















