# শৈশবের দুর্গাপূজার স্মৃতি: পুলপাড়ের মণ্ডপ থেকে বাঁশবাড়ী পর্যন্ত

*শৈশবের স্মৃতিতে জীবন্ত পুলপাড়ের দুর্গাপূজা এবং দাঙ্গার ছায়া।*

১৩ জুন, ২০২৬ · ধর্ম

## এক নজরে

- শৈশবে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া এলাকায় বসবাসকালীন পুলপাড়ের দুর্গাপূজা ছিল আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অংশ।
- ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রায়েরবাজারে আগুন লাগলে পুলপাড়ের পূজা বেশ কয়েক বছর বন্ধ হয়ে যায়।
- বাহাত্তর সালে পুলপাড়ে আবার শুরু হয় পূজা, কিন্তু শৈশবের আনন্দটা ফিরে পাওয়া যায়নি।

শৈশবে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া এলাকায় বসবাসকালীন পুলপাড়ের দুর্গাপূজা ছিল আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অংশ। দাঙ্গার ছায়ায় বেশ কয়েক বছর পূজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমি আর সেখানে যেতে পারিনি। বাঁশবাড়ীতে নতুন মণ্ডপ গড়ে উঠলেও শৈশবের আনন্দটা ফিরে পাওয়া যায়নি।

শৈশব থেকেই শুনে আসছি বারো মাসে তেরো পার্বণ। নানা রকমের পূজা। সবচেয়ে জাঁকজমকের সঙ্গে উদ্‌যাপিত হতো দুর্গাপূজা। তার আয়োজন শুরু হতো এক-দেড় মাস আগে থেকেই।

আমরা থাকতাম মোহাম্মদপুরে। তখনো মোহাম্মদপুর নাম হয়নি। লালমাটিয়া বলত। কাছে বাজার বলতে ছিল রায়েরবাজার। হাঁটাপথে দুই মাইল। মাঝামাঝি জায়গায়টার নাম পুলপাড়। এখানে একটি খালের ওপর পুল ছিল। সে জন্যই জায়গার নাম পুলপাড়। এখন পুল হয়ে গেছে কালভার্ট।

রায়েরবাজার এলাকার বেশির ভাগ পরিবার ছিল সনাতন ধর্মের। পেশায় কুমার। লোকে এটিকে পালপাড়াও বলত। সেখানে তারা মাটির তৈজসপত্র বানাত—হাঁড়ি-পাতিল, সরা, কলসি, বদনা, মটকা, কত–কী। পুলপাড়ে বিশাল আকারে পূজামণ্ডপ তৈরি হতো। প্রতিবছর দল বেঁধে পূজা দেখতাম। ওই সময় স্কুলে লম্বা ছুটি থাকত। কমপক্ষে দুই সপ্তাহ। আমরা বলতাম পূজার ছুটি।

পুলপাড়ের মণ্ডপে আমার প্রথম পরিচয় দুর্গার সঙ্গে। সেই সঙ্গে চেনা হয় তাঁর চার সন্তানকে—লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক। কার্তিকের চেহারাটা সিনেমার নায়কের মতো। গণেশের শুঁড় দেখে খুব আনন্দ হতো। মহিষাসুরকে দেখে ভয় হতো। তার বড় বড় চোখ, মুখে ইয়া বড় গোঁফ। তার বুকে দুর্গার বর্শা। এসবের ব্যাখ্যা জেনেছি আরও পরে। আর বুঝেছি বাংলা ভাষায় দুর্গা পরিবারের প্রভাব নানান রূপকে। কন্যাসন্তানের জন্ম হলে বলি, আজ যেন ঘরে লক্ষ্মী এসেছে। পরীক্ষার ফল ভালো হলে শুনি, সরস্বতী ধরা দিয়েছে। কারও ছেলেকে দেখে কেউ বলে ওঠে, ছেলেটা ভারি সুন্দর, একেবারে কার্তিকের মতো চেহারা।

১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল অঞ্চলজুড়ে। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। মোহাম্মদপুরের দাঙ্গাবাজরা রায়েরবাজারে আগুন দেয়। অনেক ঘরবাড়ি পুড়ে যায়। অনেকেই তখন এই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। একটি ছন্দপতন হয়। পুলপাড়ের পূজা বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকে।

বাহাত্তর সালে পুলপাড়ে আবার শুরু হয় পূজা। সেখানে আর যাওয়া হয়নি। আমাদের পাড়ার কাছে বাঁশবাড়ীতে দুর্গাপূজার নতুন মণ্ডপ হয়। পুলিশ পাহারা দেয়। সেখানে গিয়েছি কয়েকবার; কিন্তু শৈশবের আনন্দটা তত দিনে ফিকে হয়ে গেছে।

---
Source: https://pulsetoday.com.bd/bn/religion/shaishobeer-durgapuja-pulparer-smriti
