পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিজেপির বিরুদ্ধে জন–অসন্তোষ, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং নির্বাচন কমিশনের কথিত ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে বিতর্ক—এসবের প্রেক্ষাপটে দলটির ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। এবারও দলটি প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ভোট পেয়েছে, যা নির্বাচিত দল বিজেপির চেয়ে মাত্র প্রায় ৩০ লাখ কম। এ ছাড়া তারা মোট ভোটের প্রায় ৪০ শতাংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
দলের ভেতর থেকেই ভেঙে পড়তে দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে বিধানসভা ও লোকসভার ভেতর থেকে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তৃণমূলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিধায়ক ও লোকসভার সদস্য দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। অভিষেককে দীর্ঘদিন ধরেই মমতার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে। বিদ্রোহী বিধায়ক ও লোকসভার সদস্যরা দলের রাজ্য ও লোকসভা—দুই হাউসে নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছেন, নিজেদের পছন্দের ব্যক্তি নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। বিধানসভায় দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিধানসভা–সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ তুলেছেন।
মমতার নেতৃত্ব ও ভাবমূর্তি দুর্বল হয়েছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের মতে, দলটিকে একসঙ্গে ধরে রাখার মূল শক্তি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং ক্ষমতায় থাকার কারণে পাওয়া প্রভাব-প্রতিপত্তি। তবে এখন দলকে ধরে রাখা সে দুই প্রধান ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়েছে। একদিকে দলটির ক্ষমতা চলে গেছে, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অপরাজেয় নেত্রী’ হিসেবে যে ভাবমূর্তি ছিল, তাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন
আপাতত ৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কঠোর অবস্থান নিয়েই আছেন। তিনি বিজেপির বিজয়কে ‘অবৈধ’ ও ‘অনৈতিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রায় ১০০টি আসনে ভোট ‘লুট’ করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ বিদ্রোহকে ‘নির্লজ্জ সুযোগসন্ধান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরে কিছু মানুষ ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেছে। আর এখন আমরা ক্ষমতা হারানো মাত্রই তারা অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতায় চলে গেছে।’ তবু মমতার বিশ্বাস, দল আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তিনি বলেন, ‘আমরা দলকে নতুন করে গড়ে তুলব। তৃণমূল কংগ্রেস শুধু নেতাদের জন্য নয়, এটি কর্মীদের জন্য।’
তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কী?
বিদ্রোহ হয়তো ধীরে ধীরে কমে যাবে। ছোট পর্যায়ের বিধায়কের (যিনি আগে কমিউনিস্ট দল থেকে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন) নেতৃত্বে বিদ্রোহ করা কর্মীদের কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত আবার মমতার দলে ফিরে যেতে পারেন। তবে বর্তমানে যে বিধায়কেরা দল ভাঙার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তাঁরা তাঁদের অবস্থানে অনড় থাকলে এ সংকট আরও বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি হয়ে উঠতে পারে। তবু অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোপুরি বাদ দিয়ে হিসাব–নিকাশ করাটা এখনই ঠিক হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বলেন, ‘তিনি (মমতা) এখনো ফিরে আসতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে এমন একজন মুখ এখনো আছেন, যাঁকে মানুষ সহজে উপেক্ষা করতে পারে না এবং সেই কণ্ঠ তাঁরই।’



















