# বলিউড ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগাযোগ: সত্যি কিংবা গুজব?

*আশি ও নব্বইয়ের দশকে বলিউড ও মাফিয়া চক্রের সম্পর্ক নিয়ে অসংখ্য গল্প, গুজব, পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের নথি সামনে এসেছে।*

১৩ জুন, ২০২৬ · বিনোদন

## এক নজরে

- আশি ও নব্বইয়ের দশকে বলিউড ও মাফিয়া চক্রের সম্পর্ক নিয়ে অসংখ্য গল্প, গুজব, পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের নথি সামনে এসেছে।
- আন্ডারওয়ার্ল্ড চলচ্চিত্রে অর্থ সাদা করার জন্য এবং সামাজিক প্রভাব অর্জনের জন্য আগ্রহী ছিল।
- নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও তারকারা নিয়মিত হুমকির শিকার হতেন।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে বলিউড ও মাফিয়া চক্রের সম্পর্ক নিয়ে অসংখ্য গল্প, গুজব, পুলিশি তদন্ত এবং আদালতের নথি সামনে এসেছে। কখনো অর্থায়ন, কখনো চাঁদাবাজি, কখনো তারকাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে বলিউডের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে এই আন্ডারওয়ার্ল্ড-যোগ।

## শুরুটা কোথায়?

বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রবেশ রাতারাতি ঘটেনি। ভারতের স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে দেশটির চলচ্চিত্রশিল্পকে সরকার আনুষ্ঠানিক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে ব্যাংকঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সুযোগ ছিল সীমিত। প্রযোজকদের অধিকাংশকেই ব্যক্তিগত অর্থদাতা, ব্যবসায়ী কিংবা অনানুষ্ঠানিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতো। এই শূন্যস্থানই ধীরে ধীরে অপরাধজগতের জন্য সুযোগ তৈরি করে।

## কেন বলিউডে আগ্রহী ছিল মাফিয়ারা?

অপরাধজগতের জন্য চলচ্চিত্র ছিল একাধিক কারণে আকর্ষণীয়। প্রথমত, এটি ছিল অর্থ সাদা করার একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র। মাদক, চোরাচালান বা অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থ চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করে বৈধ আয়ের রূপ দেওয়া যেত বলে তদন্তকারী ব্যক্তিরা বহুবার অভিযোগ করেছেন। দ্বিতীয়ত, বলিউড ছিল সামাজিক প্রভাব অর্জনের একটি মাধ্যম। তারকাদের সঙ্গে ছবি তোলা, পার্টিতে উপস্থিত থাকা কিংবা চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নি করা আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা বাড়াত। তৃতীয়ত, বিদেশি বাজারে চলচ্চিত্রের বিতরণ অধিকারও ছিল লাভজনক ব্যবসা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য প্রবাসী ভারতীয়–অধ্যুষিত অঞ্চলে হিন্দি ছবির বাজার দ্রুত বাড়ছিল। ফলে চলচ্চিত্রের বিদেশি স্বত্ব নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আগ্রহও বৃদ্ধি পায়।

## নব্বইয়ের দশক: ভয়, চাঁদাবাজি ও রক্তাক্ত বাস্তবতা

নব্বইয়ের দশককে বলিউড-আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পর্কের সবচেয়ে অন্ধকার সময় বলা হয়। এই সময়ে বহু প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক এবং অভিনেতা নিয়মিত হুমকির ফোন পেতেন। চাঁদা দাবি করা হতো, না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। চলচ্চিত্র নির্মাতা রামগোপাল ভার্মা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সেই সময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের লক্ষ্য ছিল একজনকে আক্রমণ করে দশজনের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক হামলার পেছনে ছিল আতঙ্ক সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের কৌশল।

## তারকারা কি আন্ডারওয়ার্ল্ডের ঘনিষ্ঠ ছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন সময়ে কিছু বলিউড তারকার সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যক্তিদের ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। দুবাইয়ের পার্টি, বিদেশি অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে অনেক তারকার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে কোনো ছবি বা সামাজিক যোগাযোগকে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না।

## কাস্টিং ও সিনেমার ওপর প্রভাব

দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, কিছু আন্ডারওয়ার্ল্ড গোষ্ঠী নির্দিষ্ট অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে ছবিতে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করত। কোনো কোনো প্রযোজক দাবি করেছেন, ফোন করে নির্দিষ্ট শিল্পীকে সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হতো। যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিচারিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু মুম্বাই পুলিশের একাধিক তদন্তে চলচ্চিত্রশিল্পে অপরাধ চক্রের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। চলচ্চিত্র মুক্তি, বিদেশি স্বত্ব বিক্রি, সংগীত অধিকার—এসব ক্ষেত্রেও অপরাধ চক্রের আগ্রহ ছিল বলে বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

## যখন প্রিমিয়ারও ছিল আতঙ্কের

বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু একসময় বলিউডে সিনেমার প্রিমিয়ার অনুষ্ঠান পর্যন্ত বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের হুমকিতে। সম্প্রতি পরিচালক-নৃত্যপরিচালক ফারাহ খান জানিয়েছেন, করণ জোহরের প্রথম ছবি ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ মুক্তির সময়ও হুমকির কারণে প্রিমিয়ার অনুষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ ছিল। এটি প্রমাণ করে যে সমস্যা শুধু অর্থায়নেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পুরো চলচ্চিত্রসংস্কৃতিই একসময় ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করত।

## শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি: বড় মোড়

২০০০ সালের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ভারত সরকার চলচ্চিত্রশিল্পকে আনুষ্ঠানিক শিল্প খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে ব্যাংকঋণ, করপোরেট বিনিয়োগ, বীমা এবং অন্যান্য বৈধ অর্থায়নের পথ খুলে যায়। এর পাশাপাশি মুম্বাই পুলিশের বিশেষ অভিযান, সংগঠিত অপরাধবিরোধী আইন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব কমতে থাকে।

## তবু কি সব শেষ?

আন্ডারওয়ার্ল্ডের আগের সেই প্রকাশ্য দাপট এখন আর নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসে। বিভিন্ন সময় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের কাছে চাঁদাবাজির হুমকি, নিরাপত্তা জোরদার করা কিংবা গ্যাংস্টারদের নাম ঘিরে বিতর্ক সামনে এসেছে। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, নব্বইয়ের দশকের মতো পরিস্থিতি এখন আর নেই। চলচ্চিত্রশিল্পের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে গেছে, নজরদারি বেড়েছে এবং করপোরেট জবাবদিহিও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।

## মিথ, বাস্তবতা ও ইতিহাস

বলিউড-আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পর্ক নিয়ে অসংখ্য কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এর কিছু সত্য, কিছু অতিরঞ্জিত, কিছু এখনো রহস্যে ঢাকা। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একসময় মুম্বাইয়ের অপরাধজগত চলচ্চিত্রশিল্পে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। অর্থায়ন, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ—সব মিলিয়ে বলিউডের ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায় তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে এই শিল্পের হাজারো নির্মাতা, শিল্পী ও কর্মী সেই অন্ধকার সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং বৈধ কাঠামোর ভেতরে শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

---
Source: https://pulsetoday.com.bd/bn/entertainment/bollywood-underworld-connection
