মালয়ালম চলচ্চিত্র জগতের বিখ্যাত অভিনেতা সেলিম কুমার আর নেই। ৭ জুন রাতে কোচিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরে লিভারের জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। কয়েক বছর আগে তাঁর লিভার প্রতিস্থাপনও করা হয়েছিল।
সেলিম কুমার ছিলেন মালয়ালম চলচ্চিত্র জগতের এক অনন্য অভিনেতা। তাঁর সংলাপ, মুখভঙ্গি, অভিনয়ের ধরন বহু বছর ধরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মিম, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ কিংবা সাধারণ রসিকতায় তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রায় অবধারিত।
১৯৬৯ সালের ১০ অক্টোবর কেরালার নর্থ পারাভুরে জন্মগ্রহণ করেন সেলিম কুমার। ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও বিনোদনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি এরনাকুলামের মহারাজাস কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
অভিনয়জীবনের শুরুটা হয়েছিল মিমিক্রি শিল্পী হিসেবে। কেরালার জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কালাভবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি মঞ্চে পারফর্ম করতে শুরু করেন। সেই সময় কেরালার মিমিক্রি আন্দোলন অনেক শিল্পীকে চলচ্চিত্রে নিয়ে এসেছিল। সেলিম কুমারও ছিলেন সেই ধারারই একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি।
মঞ্চে তাঁর অসাধারণ কমিক টাইমিং এবং তাৎক্ষণিক সংলাপ তৈরির দক্ষতা দ্রুত তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের দরজা খুলে যায় তাঁর সামনে।
১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ইসতামানু নুরু ভাত্তাম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে। শুরুতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও খুব দ্রুত তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সত্যমেবা জায়তি’ছবিতে তাঁর ‘মাট্টানচেরি মাম্মাথু’ চরিত্রটি ব্যাপক প্রশংসা পায়।
পরবর্তী সময়ে শত শত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। একসময় এমন অবস্থা হয়েছিল যে মালয়ালাম সিনেমায় কৌতুক দৃশ্য মানেই সেখানে সেলিম কুমারের উপস্থিতি থাকবে—এটাই যেন ছিল অলিখিত রীতি।
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে খুব কম অভিনেতাই আছেন, যাঁরা কৌতুক অভিনেতার তকমা ভেঙে জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা হয়েছেন। সেলিম কুমার সেই বিরল তালিকার অন্যতম।
২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আদামিনতে মাকান আবু’ ছবিতে তাঁর অভিনয় মালয়ালাম সিনেমার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। একজন বৃদ্ধ মুসলিম ব্যক্তির চরিত্রে তাঁর সংযত, হৃদয়স্পর্শী ও গভীর অভিনয় সমালোচক ও দর্শক—উভয়ের প্রশংসা কুড়ায়।
এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ধানুশের সঙ্গে যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার পান।
ডিজিটাল যুগে সেলিম কুমার নতুন এক পরিচয় পান। তিনি হয়ে ওঠেন মালয়ালিদের ‘মিম কিং’। হতাশা, বিস্ময়, ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক কৌতুক—প্রতিটি অনুভূতির জন্য যেন তাঁর কোনো না কোনো মুখভঙ্গি ছিল। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রামে প্রতিদিনই তাঁর কোনো না কোনো দৃশ্য ভাইরাল হতো।
সেলিম কুমার ছিলেন স্পষ্টভাষী মানুষ। তিনি নিজের মতামত প্রকাশ করতে কখনো দ্বিধা করতেন না। চলচ্চিত্রে কৌতুকের মান কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি প্রায়ই কথা বলতেন। তাঁর মতে, অতিরিক্ত রাজনৈতিক শুদ্ধতার কারণে চলচ্চিত্রে স্বতঃস্ফূর্ত হাস্যরসের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
সেলিম কুমারের ব্যক্তিজীবন ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত। স্ত্রী সুনীতা এবং দুই ছেলে চন্দু ও অরোমলকে নিয়ে ছিল তাঁর পরিবার। তাঁর ছেলে চন্দুও অভিনয়জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছিলেন।



















