# চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ৫ হাজার ৫২০টি মা গাছ পাওয়া গেল

*চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চলে ৫ হাজার ৫২০টি মা গাছ পাওয়া গেছে বন বিভাগের জরিপে।*

১৩ জুন, ২০২৬ · বাংলাদেশ

## এক নজরে

- চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চলে ৫ হাজার ৫২০টি মা গাছ পাওয়া গেছে বন বিভাগের জরিপে।
- জরিপে চিহ্নিত ৭৫ প্রজাতির মধ্যে ১৭ প্রজাতির মা গছ টিকে আছে মাত্র একটি করে।
- গর্জন প্রজাতির মা গাছ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চলে জরিপ চালিয়ে ৫ হাজার ৫২০টি মা গাছের সন্ধান পেয়েছে বন বিভাগ। জরিপে চিহ্নিত ৭৫ প্রজাতির মধ্যে ১৭ প্রজাতির মা গাছ টিকে আছে মাত্র একটি করে।

বনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের নির্বিচার গাছ কাটা, বনভূমি দখল ও দুর্বল প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনের কারণে দেশীয় মূল্যবান গাছের অস্তিত্ব এখন হুমকিতে রয়েছে।

গত ২২ মে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলোতে ‘টিকে আছে মাত্র ৫০০ মা গাছ’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মা গাছের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়ের নির্দেশ আসে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে।

বন বিভাগ গত ২৩ মে থেকে টানা ১৩ দিন চট্টগ্রাম দক্ষিণ, কক্সবাজার উত্তর, কক্সবাজার দক্ষিণ, চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের আওতাধীন বনাঞ্চলে জরিপ চালায়। সেই জরিপে ৫ হাজার ৫২০টি মা গাছের সন্ধান মেলে।

মা গাছ বা ‘ফরেস্ট সিড ট্রি’ কোনো প্রজাতির এমন একটি পরিণত গাছ, যার রয়েছে উন্নত জিনগত বৈশিষ্ট্য, ভালো গঠন ও প্রচুর পরিমাণে বীজ উৎপাদনের সক্ষমতা। ফলে এই গাছ থেকে জন্ম নেওয়া নতুন গাছগুলো সবল হয়। মা গাছের বয়স কমপক্ষে ৩০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

বন বিভাগ কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের একাংশে পরিপক্ব, সুস্থ ও সোজা কাণ্ডবিশিষ্ট, বয়স, উচ্চতা, ব্যাস ও ফলন ক্ষমতার ভিত্তিতে মা গাছ নির্বাচন করেছে।

জরিপে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে তিন প্রজাতির গর্জন। এর মধ্যে আছে তেলি গর্জন, বাইট্টা গর্জন ও শিল গর্জন। এই তিন প্রজাতির মা গাছের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৮টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে ঢাকিজাম—৩০৬টি।

এককভাবে সবচেয়ে বেশি মা গাছ আছে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে। এ বিভাগে মা গাছের সংখ্যা ৩ হাজার ৬১টি। অন্যদিকে সবচেয়ে কম মা গাছে পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগে, যেখানে মাত্র ৭৭টি।

জরিপে মোট ৭৫ প্রজাতির মা গাছের সন্ধান পেয়েছে বন বিভাগ। এর মধ্যে ১৭ প্রজাতির মা গাছ টিকে আছে মাত্র ১টি করে। এসব প্রজাতির মধ্যে রয়েছে কাঞ্চন, পলাশ, পিটালি, বান্দরহুলা, বুদ্ধ নারকেল, পারুল, ধলি গর্জন, কানতে, কেরুন, সুকন, বড় জাম, কন্যালী, তেজবহল, রাজকড়ই ও গাব।

দুটি করে টিকে আছে তিন প্রজাতির মা গাছ। এগুলো হলো চন্দুল, সুন্দরি ও সাদা কড়ই।

এ ছাড়া তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি সংখ্যায় পাওয়া গেছে ১১ প্রজাতির মা গাছ। এর মধ্যে আছে জাম ৮৮টি, শাল ৬২টি, তেলসুর ৫৬টি, ডুমুর ৩৯টি, বট ৩১টি, বৈলাম ৩১টি, জারুল ২৪টি, মেহগনি ১৯টি, উরি আম ১৯টি, কদম ১৮টি ও বহেরা ১৬টি।

বন বিভাগের জরিপের সঙ্গে এফএওর জরিপের সংখ্যার তারমত্য হওয়ার কারণ গর্জনকে হিসাবে না আনা। এফএওর করা জরিপে ২০ প্রজাতির ৫০০টি মা গাছ শনাক্ত করা হয়েছিল।

এফএওর করা প্রথমবারের মতো মা গাছ নিয়ে করা জরিপের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মো. কামাল হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতে যদি মা গাছ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, তাহলে এটি দেশের বন ও প্রকৃতির জন্য ভালো খবর। কারণ, এর আগে মা গাছ নিয়ে বন বিভাগের কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার ছিল না। এখন একটি তথ্যভান্ডার তৈরি হয়েছে।

মা গাছগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বীজ সংগ্রহ করে মানসম্পন্ন চারা তৈরিতে বন বিভাগকে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এসব মা গাছের চারা থেকে বনায়ন হলে সেটি বনের বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য তৈরিতে সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।

প্রায় চার দশক ধরে কক্সবাজারের বন নিয়ে গবেষণা করা এই অধ্যাপক আরও বলেন, প্রতি হেক্টর প্রাকৃতিক বনে ৮ থেকে ১০টি মা গাছ থাকা উচিত।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করেই মা গাছ নির্বাচন করা হয়েছে। জরিপে মোট ৫ হাজার ৫২০টি মা গাছ পাওয়া গেছে।

মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘মা গাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বীজ উৎপাদনের ক্ষমতা। আমাদের জরিপে এ রকম অনেক গাছ পাওয়া গেছে, যেগুলোর আকৃতি, পরিপক্বতা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য মা গাছের মতো, কিন্তু বীজ উৎপাদন হয় না। সেগুলো মা গাছের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’

প্রতিটি মা গাছের ভৌগোলিক অবস্থান (জিপিএস) চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে একটি তথ্যভান্ডার করা হয়েছে জানিয়ে আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভাগীয় বন অফিসের অধীন থাকা প্রতিটি বিট অফিস ও রেঞ্জ অফিসকে গাছগুলো নিবন্ধিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব গাছ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালে এফএওর করা গবেষণা বলছে, কক্সবাজার অঞ্চলে দেশীয় বনজ গাছ ও মা গাছ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণ কাজ করছে। বন থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় কাঠ ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ এবং নির্বিচার গাছ কাটার কারণে দেশীয় প্রজাতির গাছগুলো উল্লেখযোগ্য হারে হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্বল প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদনও মা গাছ কমে যাওয়া আরেকটি কারণ।

অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে বনভূমি ও গাছের প্রাকৃতিক বাসস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ছে। স্থানীয় মানুষ ধীরে ধীরে বনভূমির গাছ কেটে ফেলছে এবং সেই জমিকে সবজি ও ফলের বাগানে পরিণত করছে, যা মা গাছ কমে যাওয়ার একটি কারণ।

কক্সবাজারের এই বনাঞ্চলে আগে কতটি মা গাছ ছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। তবে মা গাছের অতীত ও বর্তমান অবস্থার একটি ধারণা পাওয়া যায়।

---
Source: https://pulsetoday.com.bd/bn/bangladesh/ma-gach-pawa-gel-5-hajar-tike-achhe-17-projatir-shudhu-ekta-kore
